Sunday , 8 March 2026

প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯৩ ডলারে উঠে গেছে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এটি ১৯৮৩ সালে ফিউচারস (আগাম) লেনদেন শুরুর পর দামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক প্রবৃদ্ধি।

সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ব্র্যান্ডের জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১২ দশমিক ২১ শতাংশ বা ৯ দশমিক ৮৯ ডলার বেড়ে ৯০ দশমিক ৯০ ডলার ছুঁয়েছে। একই দিনে বৈশ্বিক মানদণ্ডের ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বা জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ৯৩ ডলারে উঠেছে, যা ২০২৩ সালের শরৎকালের পর সর্বোচ্চ। খবর বিবিসি ও সিএনবিসির

সপ্তাহজুড়ে ডব্লিউটিআই জ্বালানির দাম বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ, যা ২০২০ সালের এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উত্থান। এই উত্থানের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর আহ্বান জানান। এতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বেড়েছে, যা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিই ধসে পড়তে পারে।’

—সাদ আল-কাবি, জ্বালানিমন্ত্রী, কাতার

এদিকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পথ দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি তেলের বড় অংশ যায়।

এদিকে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি ব্রিটিশ পত্রিকা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিই ধসে পড়তে পারে। তিনি বলেন, যদি এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রভাবিত হবে।

আল-কাবির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সব তেল রপ্তানিকারক দেশই অচিরে অনিবার্য কারণে সরবরাহ চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করতে হতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন পারস্য উপসাগরে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিমা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে এতে বাজারের উদ্বেগ তেমন কমেনি।

সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে উৎপাদনেও পড়তে শুরু করেছে। ইরাকের দুজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরাক প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বন্ধ করেছে। একই সময়ে কুয়েতও সংরক্ষণাগারে জায়গা সংকটের কারণে উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের পণ্যবাজার গবেষণাপ্রধান নাতাশা কানেভা তাঁর এক বিশ্লেষণে বলেছেন, বাজার এখন শুধু ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, বাস্তব সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা হিসাব করতে শুরু করেছে। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী সপ্তাহের শেষে দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমে যেতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গত এক সপ্তাহে সাধারণ পেট্রলের দামও দ্রুত বাড়ছে। মার্কিন ভ্রমণ সংস্থা এএএর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম প্রায় ২৭ সেন্ট বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুক্রবার সপ্তম দিনে গড়ায়। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই এখন কেবল শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ইরান মনে করছে, আমরা এই লড়াই দীর্ঘ সময় চালিয়ে যেতে পারব না—এটি তাদের বড় ভুল হিসাব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *